গ্যালারি

ছোটগল্পঃ ইঁদুর দৌড়

images bb-আরে, জাকির না?
হেডফোনটা মাত্র কান থেকে সরিয়েছি, শুনতে পেলাম কেউ নাম ধরে ডাকছে। তাকিয়ে দেখি রাশিক, ছোটবেলার বন্ধু।
-আরে, রাশিক মামা নাকি?
-কি খবর দোস্ত? রাশিক দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
-আলহামদুলিল্লাহ, ভাল আছি। তোর কি খবর?
-এইতো, চলে যাচ্ছে। দেশে এসছিস কবে?
-এইতো, একুশ তারিখে।
-পাঁচদিন হয়ে গেল, কোন খবর দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলি না?
-আসলে দোস্ত, প্ল্যানড ছুটি না। আব্বা হঠাত অসুস্থা হয়ে পড়ল, হসপিটালাইজ করা লাগল, আম্মা প্রতিদিন ফোনে কান্নাকাটি করে, না এসে আর পারলাম না।
-আংকেল হাসপাতালে? বলিস কি? জানি না তো।
-অথচ এই তুই একসময় প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসতি।
-খোঁচা দিয়ে লাভ কি বল? এখন সবাই নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত। তোর ভাইটাও অসামাজিক। বিপদ আপদে আমাদের মনে করলে আমারাও কিছু করতে পারি।
-সাকি একটু অন্যরকম। ছোটকাল থেকেইতো দেখছিস।
-তা দেখছি। সাকিকে আর দোষ দিয়ে কি হবে বল? গত দশ বছরে ফেসবুকে লাইক দেয়া ছাড়া তুই নিজে কোন সামাজিকতা পালন করেছিস?
-বাব্বা, সাকিকে ছেড়ে এখন আমার আমলনামা নিয়ে পড়েছিস? আমি আবার খোঁচাই।
-বাদ দে। ভাবীর খবর কি?দেশে নিয়ে আসছিস? রাশিক জানতে চায়।
-ওর অফিস থেকে ছুটি পাওয়া গেল না। তাছাড়া বাচ্চাদের স্কুলও খোলা।
-ওহ।
হঠাত দুজনেই চুপ হয়ে যাই। নীরবে পাশাপাশি হাটতে থাকি।
-জাকির।
-বল।
-চল, ওখানে একটু বসি।
-কোথায়?
-ওখানে। রাশিক আঙুল উঁচিয়ে দেখায়।
আমি তাকাই। একটা মাল্টি স্টোরিড বিল্ডিং এর কন্সট্রাকশন চলছে।নীচে থরে থরে ইট সাজিয়ে রাখা আছে।
-ওখানে বসবি?
-হ্যা।
-আরে হাটতে থাক। সকালের এই ফ্রেশ আবহাওয়া হাটতে ভালই লাগে।
-ভাই, আমি হাটতে হাটতে টায়ার্ড। এবার একটু বসা দরকার।
-আমিতো বসতেই পারি। কিন্তু কার না কার কন্সট্রাকশান সাইট, ঢুকতে দেবে।
-দেবে না মানে, আমার কন্সট্রাকশান সাইট। আমি ঢুকব, বের হব, বসে থাকব, শুয়ে থাকব, যা ইচ্ছা করব। কোন বাপের ব্যাটা থামাবে আমাকে?
-বাব্বা, তোর কনফিডেন্স লেভেল দেখি অনেক বেড়েছে।
গেট পেরিয়ে আমরা ভেতরে ঢুকে যাই, সাজানো ইটের ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়ি।
রাশিক কোনরকমে বসে পরে দুটো ইটের ওপর, হাপাতে থাকে বিশ্রীভাবে।
আমি এই প্রথম ভালভাবে রাশিকের দিকে তাকাই। অহংকার করছি না, তবে আমি নিশ্চিত অপরিচিত কেউ এখন আমাদের দুজনকে দেখলে ব্যাচমেট বলে বিশ্বাস করবে না। রাশিকের গালের চামড়া ঝুলে গেছে, জুলফির দুপাশে পাক ধরেছে। চশমাও দেখি লাগিয়েছে একটা। তবে সবচেয়ে বাজেভাবে বেড়িয়ে আছে ভূড়িটা, লাল রঙের স্কীন টাইট টিশার্টে বিশ্রী লাগছে। এমন কাপড় পড়ে মর্নিং ওয়াক করার রুচি হয় কি করে?
-কি দেখিস? রাশিক হাপাতে হাপাতে প্রশ্ন করে।
-তোকে।
-আমাকে দেখার কি আছে? চিড়িয়াখানারর বাদর নাকি আমি?
-বাদরেরতো ভুড়ি থাকে না।
-ওহ, এটা। রাশিক নিজের ভুড়িতে হাত বুলিয়ে নেয়।
-জ্বি, জনাব ওটা।
-সবাই কি আর তোর মত স্পোর্টসম্যান? আমরা কি আর খেলার জন্য টাকা পাই?
-কিসের মধ্যে কি টানছিস? আমি পেশাদারী খেলাধুলা ছেড়েছি দশ বছর আগে। তবুও এখনো নিজের ফিটনেস ধরে রেখেছি।
-ভাই, আমি থাকি বাংলাদেশে। আমাকে কাজ করে কামাই করতে হয়। আর তুই থাকিস আমেরিকায়।
-তো? আমেরিকায় কি আমাকে ফ্রী খাওয়ায়? আমিও কাজ করেই খাই।
-ওখানেতো গলির মোড়ে মোড়ে জিম।
-তাই নাকি? দেখলাম না তো।
-এত বছর পর দেখলাম তোকে। তুই কি এখন আমার সাথে ঝগড়া করবি?
-ঝগড়া নারে ভাই, তোকে নিয়ে আমি কনসার্নড।
-কেন?
-তোর কি ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে? কিংবা হার্ট প্রবলেম?
-তুই আমার বন্ধু না শত্রু? আমাকে শুধু রোগবালাই দিতে চাস।
-ভাই, তুই কখনোই ভোরের পাখি ছিলি না। এই ভুড়িটাও প্রমান করে তোর স্বাস্থ্যসচেতনতা কতটুকু।তাহলে তুই মর্নিং ওয়াকে বের হলি কেন?
-ডায়াবেটিস।গতবছর ধরা পড়েছে। রাশিক আস্তে করে জবাব দেয়।
-তারপর থেকেই সকালে হাটাহাটি ধরেছিস?
-হু।
-রাশিক।
-বল।
-আমাদের চল্লিশ পেরলো কবে বলতো।
-তোরটা জানিনা, আমার গত বছর পার হল।
-তোর কি মনে আছে স্কুলে থাকতে আমরা প্ল্যান করেছিলাম অন্তত তিন শতাব্দী বেচে থাকব?
-হ্যা। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে দ্বাবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ।রাশিক হাসতে হাসতে জবাব দেয়।কি যে বেকুব ছিলাম আমরা।
-কেন?
-এই ফিটনেস হবে বলে মনে হয়ে তোর?
-তবে?
-এজন্যই জানপ্রান দিয়ে খাটি। মরার আগে ছেলেপেলের জন্য কিছু রেখে যাওয়া দরকার।
আমি চুপ করে শুনতে থাকি।
-এটা ছাড়াও আরো তিনটা সাইটে আমার কোম্পানি কাজ করছে। ফ্ল্যাটগুলো সব বিক্রি হয়ে গেলে পায়ের নিচে শক্ত মাটি পেয়ে যাব।
-তারপর?
-তারপর আর কি? তখন আরো বড় লোন প্ল্যান আছে। ব্যবসাটা বাড়াতে হবে না?একটু ধর।রাশিক হাত বাড়িয়ে দেয়।
-কি হল? আমি জানতে চাই।
-অনেক বেলা হয়েছে।
আমি ঘড়ির দিকে তাকাই। সাড়ে সাতটা মাত্র।
-আরে ভাই, এখন বাসায় গিয়ে গোসল করব, তারপর নাশতা। আর এই শহরের জ্যাম পেরিয়ে অফিসে পৌছাতে লাগবে অন্তত ঘন্টাখানিক। আল্টিমেটলি নয়টা পেরিয়েই যায়।
-বলিস কি? পনের মিনিটের রাস্তা এক ঘন্টা লাগে?
-এখন সাথে স্কুল টাইম আর অফিস টাইম।জ্যাম না গুনলে হবে?
-চল তাহলে।
আমি হাত বাড়িয়ে দেই, রাশিক উঠে পড়ে।আমরা দুজন হাটতে শুরু করি।
তখনই হঠাত মনে পড়ে যায় আমার। রাশিক।
-বল।
-যেখানে এতক্ষন আমরা বসেছিলাম ওখানেই ছোটবেলায় নিয়মিত খেলতাম আমরা। তাই না?
-হ্যা।
-বাবর চাচার জমি না? কেমন আছেন চাচা?
-গতবছর মারা গেছেন।চাচার ছেলেটা বাইরে থাকে, বাবার মৃত্যুর সময় দেশে এসেছিল। তখনই ডিলটা ফাইনাল করি।
-বাবর চাচা থাকলে তুই জীবনেও জমিটা পেতি না।
-তা ঠিক। চাচার ওই এক কথা, এই মাঠটা না থাকলে বাচ্চারা খেলবে কোথায়?
-রাশিক।
-বল।
-একটু আগে পাশ দিয়ে যে গাড়িটা গেল ওটা তোর ছিল না?
-হ্যা, ড্রাইভারের পাশে বসা বাচ্চাটাই আমার ছেলে। স্কুল টাইম।
-পুরাই তোর মত।
-পজেটিভলি বললি না নেগেটিভলি?
-মানে?
– মানে আমার মত মোটা?না আমার মত কিউট?
-তার মানে তুই বাচ্চার স্বাস্থ্য নিয়ে কনসার্নড?
-হব না? এত করে বলি, বাইরে যা, একটু খেলাধুলা কর। তা না, সারাক্ষণ খালি মোবাইলের স্ক্রীন আর কম্পিটারের মনিটরে তাকিয়ে থাকবে।এই বয়সে একটু না খেললে হয়?
-খেলবে কোথায়? ওদের খেলার মাঠটাতো তুই দখল করে নিয়েছিস।
আমার জবাব শুনে রাশিক হঠাত চুপ হয়ে যায়। দুজন নীরবে হাটতে থাকি।ইঁদুর দৌড়ে থাকা আরো একজন হর্ন বাজিয়ে ছুটে যায় আমাদের পাশ দিয়ে।
Advertisements
গ্যালারি

কলিযুগের রামরাজত্ব এবং খলনায়কদের তাণ্ডব

গোলাম মাওলা রনি

ছোটকালে নানী-দাদীর কাছে বসে রূপকথার গল্প শুনতাম। গল্প বলতে গিয়ে তারা রূপকথার রাজা-রানী, রাজকুমার-রাজকুমারী, উজির-নাজির কোতোয়ালের কাহিনী শোনাতেন এবং প্রসঙ্গক্রমে জল্লাদের কাহিনীও বলতেন। এসবই ছিল অতীত আমলের ঘটনা। তারা মাঝে মধ্যে দৈত্য-দানব, জিন-পরী, ভূত-পেত্নী এবং পিশাচের গল্প বলতেন। আর বলতেন কলিযুগের কল্পকাহিনী। নানী-দাদীদের মতে, কলিযুগে যেখানে সেখানে বাজার বসবে, এমনকি বেগুন গাছের তলাতে হাট বসবে। নারীরা বাজার-সদাই করবে, সমাজ থেকে মায়া-মমতা, মানসম্মান, ইজ্জত-আব্রু ওঠে যাবে। এক চোখের দজ্জাল পথে মাঠে ঘুরে বেড়াবে, পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। বেহায়া নারীরা পুরুষদের ইজ্জত মারবে আর পুরুষ জাতি নারীদের ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কাপড় চোপড় নষ্ট করবে। আমরা বলতাম ও বু (দাদী) ও নানী। কাপড় চোপড় কিভাবে নষ্ট করবে। তারা বলত- ভয়ের চোটে গোয়া গালাইয়্যা দিবে। আমরা আবার জিজ্ঞাসা করতাম- কলিযুগ কি? তারা বলতেন, কলিযুগ হলো শেষ জামানা। কেয়ামত হওয়ার আগে যে জামানা আসবে তাকেই কলিযুগ বলা হবে।

কলিযুগের সাম্প্রতিক অবস্থা এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে রামরাজত্ব সম্পর্কে কিছু বলে নিই। হিন্দুদের দেবতা রাম প্রথম জীবনে ছিলেন একজন রাজপুত্র। পরবর্তীতে তিনি রাজা হন। রামায়ণ নামক মহাকাব্যের তিনি হলেন মহানায়ক। তার রাজত্ব, জীবনযাত্রা এবং অলৌকিত্ব নিয়ে রয়েছে হাজারও উপাখ্যান। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা বা প্রধান ভগবানের নাম বিষ্ণু। রামের পিতা রাজা দশরথ ছিলেন দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। অর্থাৎ বিষ্ণু সপ্তমবারের মতো দেহ ধারণ করে দশরথ রূপে এ পৃথিবীতে এসেছিলেন। দশরথ, তার স্ত্রী কৈকী, পুত্র রাম-লক্ষণ এবং পুত্রবধূ সীতা হিন্দু পৌরাণিক ইতিহাসের কিংবদন্তি রূপে পুজিত হয়ে আসছেন সেই অনাদিকাল থেকে। রামের রাজত্বকালকে হিন্দুরা এ দুনিয়ার সর্বোত্তম শাসনামল বলে বিশ্বাস করে। কালের বিবর্তনে রামের রাজত্ব বা রামরাজত্ব শব্দটির অপভ্রংশ মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইদানীং রামরাজত্ব বলতে বোঝায় স্বৈরাচারের খামখেয়ালীপনা, অত্যাচার, অনাচার, জুলুম এবং ব্যভিচারে ভরপুর এটি শাসনামল। এটাকে আপনারা কলিকালের রামরাজত্বও বলতে পারেন, যেখানে ন্যায়ের পরিবর্তে অন্যায়, বিচারের পরিবর্তে অবিচার, আমানতের পরিবর্তে খেয়ানত, বিশ্বাসের পরিবর্তে অবিশ্বাস, সম্মানের পরিবর্তে অপমান, মর্যাদার পরিবর্তে লাঞ্ছনা, প্রশংসার পরিবর্তে ভর্ৎসনা, ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণ্য এবং শাসনের পরিবর্তে জুলুম এবং অত্যাচার শাসক গোষ্ঠীর অলঙ্কার হিসেবে আত্দপ্রকাশ করে।

রামরাজত্বের আদিরূপ এবং কলিযুগ সম্পর্কে কিছু তথ্যকথা বলা হলো। চলুন এবার কলিযুগ সম্পর্কে আমার নানী-দাদীর গল্পের ব্যাখ্যায় চলে যাই। ছোটবেলায় আমি বুঝতাম না- বেগুনতলায় হাট কিরূপে বসতে পারে। আমাদের গ্রামটি কৃষিনির্ভর হলেও বাণিজ্যিকভাবে সত্তর দশকের শুরুতে বেগুন চাষ হতো না। গৃহস্থ বাড়ির গিনি্নরা বাড়ির আঙিনায় দুই-চারটা বেগুন গাছ লাগাতেন পরিবারের তরকারির চাহিদা মেটানোর জন্য। সেসব বেগুন গাছের উচ্চতা দুই-তিন ফুটের বেশি হতো না। অন্যদিকে আমার নানাদের গ্রামে শত শত বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বেগুন চাষ হতো। নানারা ছিলেন অতীব সঙ্গতিপূর্ণ বনেদি কৃষক পরিবার। একেকজন নানার ছিল শত শত বিঘা কৃষিজমি। সেসব জমির মধ্যে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বেগুন চাষ করা হতো। দশ-বারো বিঘার একেকটি বেগুন ক্ষেতে হাজার হাজার বেগুন গাছ থাকত। আমি সেই বাগানে হাঁটতাম এবং ভাবতাম এত ছোট গাছের নিচে কলিযুগে কিভাবে বাজার মিলবে এবং কেন মিলবে। অন্যদিকে আমার মাথায় এ চিন্তাগুলো ভীষণভাবে ঘুরপাক খেত এবং আমি ভেবে পেতাম না মেয়েরা কিরূপে হাটবাজারে যাবে এবং গেলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে। তাছাড়া যেখানে সেখানে অর্থাৎ পথেঘাটে বাজার বসলেই বা ক্ষতি কি? আমার ছেলেবেলায় গ্রামগঞ্জে হাটবাজার বসত সপ্তাহে একদিন। একেকটি বাজার থেকে অন্য বাজারের দূরত্ব ছিল সাত-আট মাইল। বাজারের সব দোকানপাট ছিল ভাসমান। অর্থাৎ দোকানদাররা তাদের পণ্যসমূহ নৌকা, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি কিংবা মাথায় করে নির্দিষ্ট দিনে হাটে নিয়ে যেত। বেচাকেনা শেষে আবার যার যার বাড়িতে অবিক্রীত মালামাল নিয়ে ফিরে আসত। বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা, দালাল, ফড়িয়া, মহাজন, শ্রমিক, ঝাড়ুদার সবই ছিল পুরুষ। কোনো মহিলা বাজারে যাবেন এমন কথা আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতাম না। অন্যদিকে সংসারে পুরুষদের কর্তৃত্ব ছিল সীমাহীন। সংসারের কর্তা বা কোনো মুরব্বির সঙ্গে মহিলারা ঝগড়া করবে এটা ওই আমলে কেউ কল্পনাও করেনি। কাজেই মহিলাদের ভয়ে পুরুষরা কাপড় চোপড় নষ্ট করবে এ কথা শুনে আমরা খুব মজা পেতাম। আমার নানা ছিলেন ভীষণ রাগী এবং কড়া প্রকৃতির মানুষ। তার দাপটে বাঘে মোষে এক ঘাটে পানি খেত। আমরা নাতিরা পর্যন্ত তার ধারে-কাছে যেতে সাহস পেতাম না। নানার ছিল চমৎকার একটি র্যালি ব্র্যান্ডের সাইকেল, মারফি ব্র্যান্ডের রেডিও, ওমেগার ঘড়ি, লম্বা নলওয়ালা পিতলের হুঁকা, চা খাওয়ার জন্য দুষ্পাপ্য প্রেসার কুকার, মক্কা শরিফের জায়নামাজ-টুপি পাগড়ি এবং অনেকগুলো গল্পের বইসহ ওই আমলের বাহারি সব বিলাস সামগ্রী। আমার ইচ্ছা হতো প্রত্যেকটি জিনিস ছুঁয়ে দেখতে এবং একটু আধটু ব্যবহার করতে। কিন্তু নানার ভয়ে আমি কোনো দিন ওইগুলোকে স্পর্শ করার সাহস পাইনি। কাজেই সেই নানা কলিযুগে নানীর ভয়ে গুয়া গালাইয়্যা দিবে এমন কথা ভাবতে আমি বড়ই মজা পেতাম।

শিরোনামের দুটি শব্দ অর্থাৎ কলিযুগ এবং রামরাজত্ব সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করলাম। এবার অন্য আরেকটি শব্দ অর্থাৎ খলনায়ক সম্পর্কে কিছু বলে মূল আলোচনায় চলে যাব। মূল আলোচনা মানে- ইদানীং মানবরূপী দানবদের তাণ্ডব সম্পর্কে কিছু আলোচনা। খলনায়ক শব্দটি প্রমিত বাংলার একটি ভদ্রচিত রূপ। ইংরেজিতে একে বলা হয় ভিলেন। সেসব লোক সমাজের নেতৃস্থানীয় ভালো মানুষটির ভালো এবং জনকল্যাণকর কাজে বাধার সৃষ্টি করে এবং নিজেদের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে নানারকম অত্যাচার, অবিচার, অনাচার, অহংকার মিথ্যাচার, নির্যাতন প্রভৃতি অমানবিক কাজকর্ম দ্বারা সামাজিক পরিবেশ দুর্বিষহ করে তোলে তাদের ভিলেন বলা হয়। আঞ্চলিক বাংলায় এলাকা ভেদে ভিলেনদের একেক এলাকার মানুষ একেক নামে ডাকে। কেউ বলে- জাউরা ব্যাডা, কেউ বলে খাটাশ, আবার কেউ বলে শয়তানের বাচ্চা শয়তান।

কলিযুগের রামরাজত্বে ভিলেনদের কল্যাণে বেগুন গাছের নিচে হাট বসবে এবং এক চোখের দজ্জালের আগমন ঘটবে- এমনতরো গল্পের মধ্যেও রয়েছে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। দজ্জালের আগমন এবং তার এক চোখের কাহিনীর চমৎকার একটি ব্যাখ্যা। আমি পড়েছিলাম আল্লামা আবুল আসাদ রচিত বিখ্যাত বই ‘A Road to Macca’তে। আল্লামা আসাদ হুজুরেপাক (সা.) কর্তৃক বর্ণিত দজ্জালের ঘটনাটি ব্যাখ্যা করেছেন রূপক অর্থে। তার মতে দজ্জাল কোনো ব্যক্তি নয়- বরং একটি সমাজের বিশেষ শ্রেণির মানুষকে বোঝাবে যারা আকার আকৃতিতে মানুষ হলেও চিন্তা-চেতনা এবং কর্মে সব নিকৃষ্ট পশুদেরও ছাড়িয়ে যাবে। তাদের হিংস্রতা হায়েনাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে। তাদের নোংরামি এবং অশ্লীলতা দেখে শুয়োরকুল আফসোস করবে। তাদের স্বার্থপরতা, স্বজাতিবিদ্বেষী মনোভাব এবং অকারণে হাঁকডাক করার অভ্যাস দেখে কুকুর শ্রেণি লজ্জায় জনপদ ত্যাগ করে বনবাদাড়ে চলে যাবে। তাদের লোভলালসা এবং চুরি করার বিদ্যার বহর দেখে শিয়াল, শকুন ও খাটাশজাতীয় প্রাণীরা অনুশোচনা করতে করতে মারা যাবে। তাদের দুর্বুদ্ধি দেখে শয়তান উল্টো আল্লার দরবারে পানাহ চেয়ে বলবে- ইয়া আল্লাহ! ওদের থেকে আমাকে রক্ষা কর। অন্যদিকে দজ্জালের এক চোখ বলতে একশ্রেণির মানুষের বিবেকহীন, অমানবিক এবং নিষ্ঠুর স্বার্থপরতাকে বুঝানো হয়েছে। এ শ্রেণির মানুষ নিজেদের ক্রোধ এবং স্বার্থের জন্য গর্ভধারিণী মাকে নির্যাতন করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না- পিতাকে গলাধাক্কা দিতে গর্ববোধ করবে। অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের স্ত্রী বা কন্যাকে পর পুরুষের হাতে সমর্পণ করে এরা প্রশান্তি লাভ করবে।

২০১৫ সালের এ সময়টা কলির কাল নাকি অন্য কিছু সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না। সম্মানিত পাঠকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দেশ-কাল-সমাজ-সংসার এবং পরিবারে এমন সব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে যে, মানুষ দিনকে দিন দিশাহারা হয়ে পড়ছে। রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে এখন আর নায়ক শ্রেণির কোনো মানুষকে দেখা যায় না। যার একটু শক্তি বা সাহস আছে কিংবা যার হাতে সামান্য একটু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে সেই লোকটি নিজেকে নায়ক বানানোর পরিবর্তে খলনায়ক বানানোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। এখন জনগণ কাউকে নেতা বানাতে পারে না। খলনায়করা নিজেরাই নিজেদের নেতা বানায় এবং লোকজনকে বাধ্য করে তাদের নেতা হিসেবে সমীহ করার জন্য। জনগণ এখন আর কোনো তথাকথিত নেতাকে সম্মান করে না। বরং ভয় করে। তারা গর্ব করে বলতে পারে না- ওমুক নেতাটি সৎ এবং সত্যবাদী, তারা অবাক বিস্ময়ে খলনায়কদের দিকে তাকায় এবং মনে মনে চিন্তা করে আহা! ওরা এত মিথ্যা কথা বলে কিরূপে?

কলিযুগের হাটবাজার, ফুটপাথ, গণশৌচাগার, কৃষিজমি, জনপদ, লোকালয়, গ্রাম, শহর, স্কুল, কলেজ, অফিস-কাচারি, নদী-নালা, খাল-বিল সাগরতীর এবং উপকূল বনভূমি, রাজপথ প্রভৃতি সবকিছুকে আলাদা আলাদা রাজ্য বানিয়ে খলনায়করা সেখানে তাদের রাজরাজত্ব কায়েম করেছে। এসব রাজ্যের প্রজারা দজ্জালরূপী খলনায়কদের আতঙ্কে সারা দিন আল্লাহ আল্লাহ জিকির করে। ফলে পাড়া-মহল্লায় মসজিদগুলোতে হঠাৎ করেই লোকজনের উপস্থিতি বেড়েছে। সামাজিকতার বন্ধন দিনকে দিন আলগা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না- এমনকি লোকজনের চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করার নানা ফন্দি-ফিকির চলার কারণে কেউ আর স্বাধীন চিন্তাভাবনা করছে না। সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি স্থায়ীরূপে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। চাকরগুলো সব মনিবের দায়িত্ব পালন করছে এবং মনিবরা চাকর হওয়ার জন্য পাগলামো করছে। রক্ষকরা ভক্ষকরূপে আবির্ভূত হয়েছে- আমানতদার খেয়ানত করে উল্লাস নৃত্য করছে এবং মূর্খরা সব শিক্ষক হয়ে জ্ঞানের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে ব্যভিচারের কলাকৌশল শিক্ষা দিচ্ছে।

আমরা আজকের প্রসঙ্গের একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। কলিকালে বেগুনতলায় হাট মিলবে এ কথাটি সম্পর্কে আমার বক্তব্য পেশ করে লেখার ইতি টানব। প্রাচীনকালে বৃহৎ কোনো বটবৃক্ষের তলায় কিংবা নদীতীরে হাট বসত। বেগুনতলায় হাট বলতে গোপন বেচাকেনা ক্রেতা-বিক্রেতাদের সংকীর্ণতা, দুর্বলতা, নীচুতা এবং অব্যবসায়ীসুলভ মনমানসিকতা এবং আচরণকে বোঝানো হয়েছে। সেই অর্থে কলিকালের খলনায়করা ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবর্তে চোরাকারবার শুরু করবে। পণ্য কেনাবেচার চেয়ে অন্যের জিনিস জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া বা লুট করাকে কর্তব্য বলে মনে করবে। প্রকাশ্য স্থানে এসব করার সুযোগ না থাকায় তারা সংকীর্ণ এবং অন্ধকারময় স্থানকে বেছে নেবে অনেকটা বেগুনগাছের তলার জায়গাটির মতো যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব নয়- আরাম করে বসাও সম্ভব নয় কিংবা শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তবে অন্ধকার রাতে কোনো চোর জড়োসড়ো হয়ে বেগুনগাছের তলায় ইচ্ছা করলে লুকিয়েও থাকতে পারে…।

তথ্যঃ

গ্যালারি

আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা স্বপ্নের ফাইনালে পৌঁছে গেল ।


অভিন্দন বাংলাদেশ ফুটবল টাইগারদের ।
খেলার শুরু থেকেই হাজার হাজার দর্শকের গর্জন বাংলাদেশ বাংলাদেশ । ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলায় যেমন দাপুটে ছিল বাংলাদেশ সমর্থকদের তেমন গর্জনেও ছিল সেই দাপট । মাঠের খেলা আর গ্যালারির গর্জনের যুগলবন্ধনে পরাস্ত হল বিপক্ষ আফগানিস্তান । দুরন্ত সাদ উদ্দিনের মহাকাব্যিক এক গোলে প্রথমবারের মতো সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশ । এ যেন আমাদের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয় । আগামীকাল ভারতের বিপক্ষে শিরোপা লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশের ফুটবল টাইগাররা । সকলের কাছে আমাদের প্রিয় টাইগারদের জন্য দোআ প্রাথনা কামনা করছি ।

গ্যালারি

বুর্জ খলিফা বর্তমান পৃথিবীর সব থেকে উচ্চু অট্টালিকা

বুর্জ খলিফা বর্তমানে পৃথিবীর সব থেকে উচ্চু অট্টালিকা । এই অট্টালিকাটি ২০১০সালের ৪ঠা জানুয়ারী তারিখে উদ্বোধন করা হয় ।এই অট্টালিকাটি আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত । এটি দুবাই টাওয়ার নামেও পরিচিত হলেও এটিকে নির্মাণকালে এর বহুল প্রচারিত নাম ছিল বুর্জ দুবাই পরে এটিকে উদ্বোধনের সময় নাম চেন্জ করে বুর্জ খলিফা রাখেন ।
এই অট্রালিকাটি উচ্চতা প্রায় ৮১৮ মিটার বা ২,৭১৭ ফুট যা রোড মাপে প্রায় আধা মাইল । এই অট্রালিকাটি তাইওয়ানের তাইপে ১০১ টাওয়ার থেকে ১০০০ ফুটেরও বেশী উচু টাওয়ার । ভবনটির উচ্চতা ১৬৬৭ ফুট । ২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ পযন্ত পর্যন্ত এই টাওয়ারটিই ছিল পৃথিবীর সব থেকে উচ্চতম স্থাপনা । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অবস্থিত উইলিস টাওয়ারটি ১ ৪৫১ ফুট উঁচু । বুর্জ খলিফা টাওয়ারটি এতই উঁচু একটি ভবন যে নিচতলা আর সর্বোচ্চ তলার মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস ।
টাওয়ারটির কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলো ।
বুর্জ খলিফার টাওয়ারটি নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৪ সালে আর এটির কাজ শেষ হয় ২০০৯ সালে । এটি তৈরীতে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয় । এর বহিপ্রাঙ্গনে অবস্থিত ফোয়ারা নির্মাণেই ব্যয় হয়েছে ১৩৩ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড । এই ভবনে ১০৪৪টি বাসা বা এপার্টমেন্ট আছে । ১৫৮তলায় আছে একটি মসজিদ ৪৩তম এবং ৭৬তম তলায় আছে দুটি সুইমিং পুল । আরো আছে ১৬০ কক্ষবিশিষ্ট একটি হোটেল । ১২৪তম তলায় দর্শকদের জন্য প্রকৃতি দর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে । এই টাওয়ারটির সংস্থাপিত কোনো কোনো লিফটের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ মাইল । ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে শিলান্যাসের পর থেকে অতি দ্রুত নির্মাণ কাজ অগ্রসর হয়েছে । এমনো দিন গেছে যে দিন ১২ হাজার নির্মাণ কর্মী একযোগে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত ছিল । সে সময় প্রতি তিন দিন পর পর একটি ছাদ তৈরি করা হয়েছে ।
তলা বিন্যাস
অট্রালিকাটি কোন তলা কোন কাজে ব্যবহার ।
১৬০–২০৬ কারিগরি
১৫৬–১৫৯ যোগাযোগ ও সম্প্রচার
১৫৫ কারিগরি
১৩৯–১৫৪ কর্পোরেট স্যুট
১৩৬–১৩৮ কারিগরি
১২৫–১৩৫ কর্পোরেট স্যুট
১২৪ পর্যবেক্ষণাগার
১২৩ স্কাই লবি
১২২ এট.মোসফিয়ার রেস্টুরেন্ট
১১১–১২১ কর্পোরেট স্যুট
১০৯–১১০ কারিগরি
৭৭–১০৮ আবাসিক
৭৬ স্কাই লবি
৪৪–৭২ আবাসিক
৪৩ স্কাই লবি
৪০–৪২ কারিগরি
৩৮–৩৯ আরমানি হোটেল স্যুট
১৯–৩৭ আবাসিক
১৭–১৮ কারিগরি
৯–১৬ আরমানি বাসস্থান
১–৮ আরমানি হোটেল
নিচতলা আরমানি হোটেল
খোলা স্থান আরমানি হোটেল
বি১–বি২ পার্কিং, কারিগরি

তথ্য
“Official Opening of Iconic Burj Dubai Announced”

গ্যালারি

বিষয় হোটেল ডি সাল ( ওরফে হোটেল লবন ) ঘটনা বলি

indexzz
এই বিশ্ব সম্পর্কে এখন আমাদের অনেক কিছু জানার বাকি আছে
যা ধারণার বাহিরে । যেমন এইযে আজকে এই পোস্টে যে বিষয়টি নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হলাম তা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আর তা হল আজ আপনাদের লবন হোটেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া । চলুন প্রথমে এই লবন হোটেলের নামের সাথে পরিচয় হই । এই হোটেলটি ইংরেজীতে হোটেল ডি সাল নামে পরিচিত । আর এটি বলিভিয়ার দক্ষিন পশ্চিমাংশের উইনি লবন পল্লীতে অবস্থিত । এটি অবশ্য ১৯৯৩ সালে নির্মিত হলেও এটিকে
২০০৭ সালে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয় । এই হোটেলটি পরিপূর্ণ লবন দিয়ে বানানো । এটি রাজধানী লা পাজ শহর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিনে পৃথিবীর সব থেকে বড় সমতল লবন ক্ষেত্রে অবস্থিত । হোটেলটির ভেতরের সকল আসবাবপত্র থেকে শুরু করে এর বিছানা দরজা জানালাগুলোও জমাট লবন ব্লকে তৈরি । পুরো হোটেল ভবনটি বানাতে ৩৫ সেন্টিমিটার পুরু ১০ লাখ লবনের ব্লক লেগেছে । হোটেলটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬৫০ মিটার উপরে অবস্থিত । হোটেলের দেয়ালগুলো বানানো হয়েছে লবন ও পানি মিশ্রনে । হোটেলটির ভেতরে ১৫ টি ঘর সহ স্টাইল রুম ও রেস্তরা বার সহ আধুনিক সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে ।

গ্যালারি

আপনি আত্মহত্যা না করে চাইলে বাঁচতে পারেন

আত্মহত্যা বা আত্মহনন করা হচ্ছে একজন নর কিংবা নারী কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ করা । প্রথমেই আমাদে জেনে নেওয়া দরকার ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে এর অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা বা সেচ্চায় জীবন ত্যাগ করা । যখন কেউ আত্মহত্যা করেন তখন জনগণ এই প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে থাকেন । ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করেছেন । ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে । অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচিত করেছেন । যিনি নিজেই নিজের জীবন প্রাণ বিনাশ করেন তিনি আত্মঘাতক, আত্মঘাতী এবং আত্মঘাতিকা, আত্মঘাতিনীরূপে সমাজে পরিচিত থাকেন ।
প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করেন । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাদের মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যাই হলো ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ । কিশোর কিশোরী আর যাদের বয়স পয়ত্রিশ বছরের নিচে তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা । নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি । পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি ।
অনেক সময় নিরীহ জনসাধারণের উপর হামলার মাধ্যমে হত্যা করার জন্যও ব্যক্তির আত্মহত্যাকে এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে । একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী বোমা বহন করে কিংবা তার শরীরে টেপ দিয়ে বোমা বেধে রেখে জনতাকে হত্যার লক্ষ্যে অগ্রসর হয় এবং বোমা ফাটায় এরফলে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী নিরীহ জনগণকে হত্যা কিংবা আহত করে এবং নিজেও এর শিকার হয় । সাধারণত বোমা বহনকারী ব্যক্তি নির্মমভাবে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে থাকে কিংবা গুরুতর আহত হয়ে থাকেন ।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আত্মঘাতী হামলার উদাহরণ রয়েছে । যেমন কামিকাযিদের আক্রমণ অন্যতম । তারা জাপানী বোমারু বিমানের পাইলট হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সৈনিকদের হত্যার লক্ষ্যে নৌবহরে তাদের বিমানকে সংঘর্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন ।
১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী বোমা হামলা পরিচালিত হয় । এতে উড়ন্ত বিমানকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সুউচ্চ ভবন ও পেন্টাগনকে লক্ষ্য করে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছিল যা মানব ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ।
তাছাড়াও ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৯১ সালের ২১ মে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের শ্রীপেরামবুদুরে এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন । ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত পায় । উক্ত বিস্ফোরণে রাজীব গান্ধী ছাড়াও আরও চৌদ্দ জন নিহত হয়েছিলেন ।
নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭ থেকে ৯৮% আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয় । তাছাড়াও আত্মহত্যাজনিত ঝুকির মধ্যে অন্যান্য বিষয়াদিও আন্তঃসম্পৃক্ত। তারমধ্যে নেশায় আসক্তি ও জীবনের উদ্দেশ্য খুজে না পাওয়া এবং আত্মহত্যায় পারিবারিক ঐতিহ্য অথবা পূর্বেকার মাথায় আঘাত অন্যতম প্রধান কারন ।
আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, গৃহহীনতা এবং বৈষম্যতাজনিত উপাদানগুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে । দারিদ্র্যতা সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয় । কিন্তু এটি বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুকি বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগজনিত কারণে আত্মহত্যার উচ্চস্তরে ব্যক্তি অবস্থান করে । শৈশবকালীন শারীরিক ইতিহাস কিংবা যৌন অত্যাচার বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সময় অতিবাহিতজনিত কারণও ঝুকিগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত আছে । হারহামেশায় দেখা যাচ্ছে বর্তমানে প্রেমে ব্যার্থতা বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে চলেছে । পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি না দেওয়ায় প্রেমিক যুগলের সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনাও প্রায়ই ঘটে চলছে ।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে আত্মহত্যাকে মানসিক অসুস্থতাসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে । উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে এ ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি । যখন একজন ব্যক্তি আত্মহত্যার বিষয়ে ব্যাপক চিন্তা ভাবনা শুরু করেন তখনই তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে । মনোবিদগণ বলেন যে যখন ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে তা জানামাত্রই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে কাউকে জানানো । ভুক্তভোগী ব্যক্তি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে কিভাবে আত্মহত্যা করবেন তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । যে সকল ব্যক্তি দুঃশ্চিন্তায় পড়েন তারা আত্মহত্যায় সর্বোচ্চ ঝুকিপূর্ণ দলের অন্তর্ভূক্ত । উন্নত দেশে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চরম মুহুর্তজনিত হটলাইন রয়েছে যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের চিন্তা ভাবনা এবং আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা জানায় । হটলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ভুক্তভোগী তার সমস্যার সমাধানের পথ সম্পর্কে অবহিত হয়ে আত্মহত্যা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতা মত অনুযায়ী নিজেকে ভালবেসে আত্মহত্যা থেকে বাচার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয় । যেমন যখন কোন প্রেমিক প্রেমিকার যখন আত্মহত্যা করেন ।তখন তাকে ভাবতে হবে সে চলে গেছে বলে এখানেই শেষ নয় এই শেষ থেকেই নিজের জীবনতাকে আবার অন্যভাবে নতুন করে সাজিয়ে নিতে হবে ।
তাকে দেখিয়ে দিতে হবে সে যদি আপনাকে ছেড়ে দিয়ে যেয়ে সুখী হতে পারে তাহলে আপনি কেন তাকে ছাড়া সুখী হতে পারবেন না । আপনাকেও তাকে ছাড়া সুখী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং সেখানে আপনি নিশ্চিত জয় লাভ করবেন ।
বরং আপনি আত্মহত্যা না করে চাইলে বাঁচতে পারেন এবং আপনার কাছ থেকে আর দশ জন তরুনতরুনী শিখবে যে কিভাবে নিজেকে
শেষ হওয়া থেকেও আবার নতুন করে শুরু করা যায় ।

আপনি চাইলে এখানে পুরো ঘটনা পড়তে পারেন ।